Thursday, January 26, 2023
Homeজেলার খবরস্বয়ং‌ক্রিয় কলের পানিতে চলছে সীমান্তের ৪ গ্রাম । শেরপুর সংবাদ

স্বয়ং‌ক্রিয় কলের পানিতে চলছে সীমান্তের ৪ গ্রাম । শেরপুর সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার: শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী উপজেলার সীমান্তবর্তী ৪ গ্রামের মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে যাদু’র কল বা অটোকল (টিউবওয়েল লাইন)। এ যাদু’র কল বা অটোকলের কারণে ওই গ্রামের শত শত কৃষকের বোরো-আমন আবাদ ও সবজিসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে পানির জন্য হাহাকার করতে হয়না। বিদ্যুৎ ও তেল চালিত সেচের জন্য বসেও থাকতে হয়না তাদের।

অটোকলের আর্শিবাদে প্রাকৃতিক পানির সেচ দিয়েই ভরে যাচ্ছে ওই ৪ গ্রামের প্রায় ১ হাজার একরের বিভিন্ন ফসলের মাঠ। ফলে বছরে প্রায় কয়েক কোটি টাকার সেচ খরচ থেকেও বেঁচে গেছে ওইসব গ্রামের মানুষ। তবে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় এ পানির সুষ্ঠ ব্যবহার করে আশ-পাশের অনাবাদি আরো হাজার হাজার একরের জমিতে বোরো-আমনসহ বিভিন্ন ফসলের মাঠ সবুজ হয়ে উঠতে পারে বলে স্থানীয় গ্রামবাসী, আদিবাসী নেতৃবৃন্দ এবং কৃষি বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছে।

শেরপুর জেলার প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের ভারতের মেঘালয় রাজ্য সীমান্ত ঘেষা বিদ্যু ও রাস্তা-ঘাট বিহীন পাহাড়ি প্রত্যন্ত রাঙ্গাজান, বালিঝুড়ি, খ্রিষ্টান পাড়া ও অফিস পাড়া গ্রাম। গ্রাম গুলোতে ৫ থেকে ৬ হাজার লোকের বসবাস। গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষ কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল। ওই ৪ গ্রামের পাশ দিয়েই অর্ধ বৃত্তাকারে বয়ে গেছে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি সুমেশ্বরী নদী। ওই নদিতে এক সময় চৈত্র মাসেও পানি থাকতো। প্রায় এক যুগ আগেও ওই পানি দিয়েই ওই ৪ গ্রামসহ আশপাশের আরো অনেক গ্রামের মানুষ বোরো-আমন আবাদ এবং অন্যান্য মৌসুমের সবজি আবাদসহ বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ করতো। এক সময় নদীর পানি শুকিয়ে যায়। চাষাবাদের পরিমানও কমতে শুরু করে গ্রামগুলোতে।

প্রায় এক যুগ আগে প্রথমে রাঙ্গাজান গ্রামের মানুষ খাবার পানির জন্য টিউবওয়েল বোরিং করতে গিয়ে দেখলো যে ৬০ থেকে ৮০ ফুট বোরিং করার পর ওই বোরিং বা খাদা বা গর্ত থেকে অনবরত পানি উঠতে লাগলো। গ্রামবাসী তখন এটা ঈশ্বর বা আল্লাহর দান ভেবে টিউবওয়েলের মাথা বা চাপকল না বসিয়েই সে পানি পান এবং গোছল করাসহ বিভিন্ন গৃহস্থলির কাজে ব্যবহার করা শুরু করে। আস্তে আস্তে আশপাশের অফিস পাড়া, খ্রিষ্টান পাড়া ও বালিঝুড়ি গ্রামের মানুষও ১.৫ ইঞ্চি পাইপ দিয়ে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ ফুট পাইপ বোরিং করে ওই পানি ব্যবহার করতে লাগলো।

স্থানীয় ভাবে ওই পানির লাইনের নাম হয়ে যায় ‘অটোকল’। তবে গ্রামের অনেকই এটাকে যাদু’র কল বলেও অভিহিত করে থাকে। আবার গ্রামের কেউ কেউ এই পানি আল্লাহর দান ভেবে ব্যবহার করে আসছে। উপকারভোগী কয়েকজন গ্রামবাসী জানায়, বর্তমানে ওই ৪ গ্রামের প্রায় ১ হাজার একর জমিতে বোরো আবাদ করা হচ্ছে। এতে তাদের কেবল মাত্র সার ও কিটনাশক ছাড়া আর কোন খরচ হয়না।

তবে এলাকার সচেতন নৃ-‌গোষ্ঠী নেতৃবৃন্দ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, ওই পানির সুষ্ঠ ব্যাবহার করে বিশেষ করে বছর জুড়ে যে পরিমানের পানি অপচয় হয় ওই অপচয়কৃত পানি কাজে লাগিয়ে আশপাশের অন্যান্য গ্রামে যেখানে অটোকল নেই সে সব গ্রামে এবং পাহাড়ের ওইসব জমির চেয়ে অপেক্ষমান একটু উচু জমিতে পানির ক্যানেল বা খাল খনন করে পানি জমিয়ে পরবর্তিতে দেশীয় পদ্ধতি সেচের মাধ্যমে আরো প্রায় কয়েক হাজার একর জমিতে বোরাসহ বিভিন্ন ফসল ফলানো সম্ভব। তবে এতে সরকারের সহযোগীতা একান্ত প্রয়োজন।

ইতিমধ্যে একটি এনজিওর মাধ্যমে খ্রিষ্টান পাড়ায় অটোকলের পানি জমিয়ে রাখতে বেশ কয়েকটি চৌবাচ্চা বা টেংকি তৈরী করে দিয়েছে। এতে পানি জমিয়ে রেখে পরবর্তিত সেই পানি তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় যদি ওই এলাকায় কোন প্রকল্প গ্রহনের মাধ্যমে অপচয়কৃত পানি এবং আরো বেশী করে বোরিং করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি নিয়ে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে পানি সরবরাহ করা যায় তবে আরো অধিত জমিতে অল্প খরচে অধিক ফসল ফলানো যাবে। তাতে সীমান্তবর্তী ওইসব হতদরিদ্র মানুষ একদিকে যেমন কম খরচে এবং কম পরিশ্রমে অধিক ফসল ফলাতে সক্ষম হবে অপরদিকে তাদের ভাগ্যেরও আরো পরিবর্তন হবে বলে মনে করছে এলাকাবাসী।

হারিয়াকোনা গ্রামের নৃ‌গো‌ষ্ঠেী নেতা প্রাঞ্জল এম সাংমা বলেন, প্রায় দুই যুগ আগেও আমাদের এই পাহাড়ি এলাকায় অনেক ঝোড়া বা ঝর্ণা ছিল। সে ঝর্ণা দিয়ে বছরের সব সময় পানি প্রবাহিত হয়ে পাশের সুমেশ্বরী নদিতে বয়ে যেতো। কিন্ত এখন স্ব‌প্নের মতো মনে হয়। সেই ঝর্ণাও নেই। নদিতে পানিও নেই। গত প্রায় ২০ বছর ধরে চৈত্র মাস আসার আগেই ওই নদির পানি শুকিয়ে যায়। ফলে আমরা প্রায় ২০ বছর আগে পানির সমস্যার কারনে কোন ফসল ফলাতে পারি নাই। কিন্তু গত ৮ থেকে ১০ বছর আগে এই অটোকলের সাহায্যে আমরা আবার আবাদ- ফসল ফলাতে পারছি।

তবে সরকারী ভাবে এ পানির সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা করলে আশপাশের আরো অনেক গ্রামের মানুষ উপকার পাবে। অফিস পাড়া গ্রামের কলেজ শিক্ষার্থী লিটন বলেন, এ অবহেলিত গ্রামে অটোকল আমাদের জন্য আর্শিবাদ হয়েছে । জেলা জনস্বাস্থ‌্য বিভাগের শ্রীবর্দী উপজেলার প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান বলেন, আসলে এই ধরনের পানির লেয়ার পাহাড়ের পাদদেশে অনেক সময় বের হয়, সেটা আসলে স্প্রিং লেয়ার। এটাকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে সংরক্ষণ করে উক্ত জনপদের মধ্যে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ বিষয়টি আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular